দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে স্কুল ব্যাংকিং একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করেছে। খুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, অর্থ ব্যবস্থাপনার বুনিয়াদি জ্ঞান শেখানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যে যে উদ্যোগটি ২০১০ সালে শুরু হয়, তা আজ একটি শক্তিশালী আর্থিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, মাত্র তেরো বছরে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ৪৮ লাখ ছাড়িয়েছে এবং এসব অ্যাকাউন্টে আমানত দাঁড়িয়েছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। এ উদ্যোগের গতি, বিস্তার এবং জনগণের সম্পৃক্ততা দেখে বোঝা যায়- বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথকে টেকসই করতে স্কুল ব্যাংকিং ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শুরুটা ছিল ছোট। শিক্ষার্থীদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়টি প্রথমে অনেকের কাছে নতুন ছিল। কিন্তু ন্যূনতম ব্যালেন্স ছাড়া অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা, উচ্চ সুদের হার, শিশুবান্ধব কাউন্টার, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা- এসব ব্যবস্থার কারণে অল্প সময়েই কর্মসূচিটি গ্রহণযোগ্যতা পায়। এখন গ্রাম থেকে মহানগর- সব জায়গাতেই স্কুল ব্যাংকিং হয়ে উঠেছে সঞ্চয় ও আর্থিক শৃঙ্খলার একটি সহজ মাধ্যম। ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ প্রায় সমান, বরং সঞ্চয়ে মেয়েরা আরও এগিয়ে আছে- এটিও একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। পরিবারে মেয়েদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ বাড়ছে, আর্থিক সচেতনতা উন্নত হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে লিঙ্গসমতায়ও ভূমিকা রাখবে।
তবে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয় কিছুটা কমেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক আর্থিক সংকোচন এবং ব্যাংক খাতে অনিশ্চয়তার প্রভাব এর অন্যতম কারণ।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় শিশুদের জন্য সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা চাইল্ড ট্রাস্ট ফান্ড বহু বছর ধরেই চালু। যুক্তরাজ্যের চাইল্ড ট্রাস্ট ফান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ইয়ুথ সেভিংস প্রোগ্রাম- যার একটি মূল উদ্দেশ্য থাকে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করা। এই কর্মসূচিগুলো সাধারণত পরিবারের আর্থিক স্থিতি, সরকারি প্রণোদনা এবং ব্যাংকের সুবিধার ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস ফেডারেল রিজার্ভের এক গবেষণায় দেখা যায়- যেসব শিশু নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে, তারা ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশি দায়িত্বশীল হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকে। বাংলাদেশে ১৮ বছর পূর্ণ হলে এসব অ্যাকাউন্ট সাধারণ সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এতে একটি শিশুর আর্থিক যাত্রা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তা স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নেয়। ইতোমধ্যে ১১ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে রূপান্তরিত হয়েছে- এটি ভবিষ্যৎ আমানতকারী শ্রেণি তৈরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বাংলাদেশে মোট অ্যাকাউন্টের প্রায় ৭০ শতাংশ খুলেছে বেসরকারি ব্যাংক, আমানতের ৭৭ শতাংশও তাদের কাছে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের ব্যাংকিং প্রোগ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এগিয়ে থাকে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের সাফল্য ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন নিশ্চিত বিশ্বাসযোগ্যতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা। উন্নত দেশগুলোতে সাইবার সেফটি, অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবহারের নিয়ম এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষা- এসব বিষয়ে শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই অংশটি শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- শিশুদের সঞ্চয় প্রোগ্রাম তখনই সফল হয় যখন পরিবার ও বিদ্যালয় উভয় ক্ষেত্রেই আর্থিক শিক্ষার সমন্বয় থাকে। বাংলাদেশে অনেক স্কুলে এখনও কার্যকর আর্থিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অথচ একটি শিশুকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে দিলে তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা উচিত অর্থ ব্যবস্থাপনার ন্যূনতম ধারণা, আয়ের উৎস, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দক্ষতা। ব্যাংকগুলোকে স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, আর সরকার চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রমে এই অংশটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বে যেখানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার অসম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সেখানে বাংলাদেশের স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত। এটি ভবিষ্যতের সঞ্চয়কারী, বিনিয়োগকারী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ভিত্তি তৈরি করছে। সঞ্চয়ে সাময়িক ভাটা পড়লেও উদ্যোগটি সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী, বিস্তৃত ও টেকসই। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং আর্থিক শিক্ষাকে আরও দৃঢ় করে স্কুল ব্যাংকিংকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার আরও কার্যকর সঙ্গী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।