প্রতিকারে জরুরি পদক্ষেপ নিন

ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক। বায়ুদূষণে শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। নদ-নদী ও সবুজের সমারোহে ভরা দেশের এই বৈসাদৃশ্য নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্বের সবচেয়ে বায়ুদূষিত শহর হিসেবে শীর্ষে উঠে এসেছে ঢাকা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ু পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সকাল সাড়ে ১০টার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ২৯৪, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ সীমার কাছাকাছি এবং বিপজ্জনক মাত্রার প্রায় সমান। শ্বাস নিতে গেলে জ্বালা, চোখে পানি, মাথাব্যথা-এসব এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। বায়ুদূষণ আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি এখন ঢাকার সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণে ভুগছে ঢাকা, যা আমাদের জন্য বিপদ সংকেত।

অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হওয়া এই দূষণ চক্রাকারভাবে বেড়েই চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলা উড়বে-এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ঢাকায় সমস্যা স্বাভাবিকতার অনেক বাইরে। রাস্তার বেহাল অবস্থা, নির্মাণকাজের অব্যবস্থা, পুরনো যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন-সব মিলিয়ে শহরটি যেন ধোঁয়া-ধুলার এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি। দিনের পর দিন নগরবাসী এই বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফুসফুস, হৃদ?যন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী-সবচেয়ে ঝুঁঁকিতে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি প্রায় বিপর্যয়ের দিকে। দূষণের মাত্রা শুধু বেড়েই চলছে না, তা এখন অঞ্চলগতভাবেও ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের অনেক শহরে বায়ুর মান ঢাকাকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানীর ভেতরেও কয়েকটি এলাকা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে-প্রতিবার শীত এলেই একই সতর্কতা, একই অসহায়তা, একই নিষ্ক্রিয়তা দেখা যায়। কিন্তু কার্যকর সমাধানের পথে অগ্রগতি সামান্যই। সে জন্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন-অব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বহু প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নের গতি নেই। মেট্রোরেল, সড়ক সম্প্রসারণ বা ড্রেনেজ নির্মাণ-সবখানেই ধুলা কমানোর জন্য নিয়মিত পানি ছিটানো, সাইট ঘেরা রাখা, নির্মাণবর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ-এসব ন্যূনতম নিয়মও মানা হয় না। ফলে নির্মাণকাজ ঢাকার দূষণের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে পুরনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া বা শিল্প-কারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা প্রায় অনুপস্থিত। নীতি আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।

দিল্লি-লাহোরের মতো দূষণপ্রবণ শহরগুলোর অবস্থাও এ মৌসুমে খারাপ। দিল্লি কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটানোর প্রচেষ্টা রয়েছে। ঢাকায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এই পরিস্থিতি আর অবহেলা করার মতো নয়। বায়ুদূষণ এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, অর্থনীতি-সমাজ সবখানেই প্রভাব ফেলছে। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে, শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি অনেক পরিবার শহর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবছে-এটি পরিবেশ সংকটের পাশাপাশি নগর পরিচালনার ব্যর্থতারও প্রতিফলন। এখনই দরকার রাষ্ট্রীয় ও নগর পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনা। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও জরুরি উদ্যোগ। বায়ু দূষণে শিল্প-কারখানার নির্গমন ও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দূষণ বৃদ্ধির মূল উৎস। শিল্পাঞ্চলগুলোতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ও আধুনিক নির্গমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। অনেক কারখানায় আধুনিক নির্গমন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যবস্থা থাকাই যথেষ্ট নয়- বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত টিম, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

এ ছাড়া শহরের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত পানি ছিটানো, যান্ত্রিকভাবে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া এবং নির্মাণবর্জ্য দ্রুত অপসারণ-এসবকে রুটিন কাজ হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সবুজায়নও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; সড়কদ্বীপ, পার্ক, খালি জায়গা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ-সবখানেই গাছ বৃদ্ধি ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটি সমন্বিত ‘ক্লিন এয়ার অ্যাকশন প্ল্যান’ অতি দ্রুত বাস্তবায়নে যেতে হবে। ঢাকার আকাশ আর কতদিন ধুলায় অন্ধকার থাকবে? নগরবাসীর শ্বাস নেওয়ার অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তবে সরকার ও পরিবেশ সংগঠনই শুধু নয়, নাগরিকদের সচেতন হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *