একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি শুরু হয় মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই। এখানেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। দুঃখজনক হলেও সত্য, চলমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এই প্রাথমিক ধাপেই কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে- যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, দায়িত্বহীনতা এবং রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত অভিযোগের পরও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনের ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতরেই এক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠা শুধু নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়, এটি নির্বাচনী প্রশাসনের কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাও তুলে ধরে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সামনে এমন ঘটনা ঘটার পরও যদি কোনো পক্ষকে কারণ দর্শানো বা জবাবদিহিতার আওতায় আনা না হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে- রিটার্নিং কর্মকর্তারা আদৌ কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছেন?
একইভাবে কুড়িগ্রাম-৩ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বসংক্রান্ত অভিযোগে একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হলেও অন্য আসনে একই অভিযোগে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ নির্বাচনী সিদ্ধান্তে দ্বৈত মানদণ্ডের আশঙ্কা তৈরি করেছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত যদি একরকম ও নীতিনিষ্ঠ না হয়, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকেই নয়, পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে যেখানে একটি নির্মোহ, দলনিরপেক্ষ প্রশাসনের প্রত্যাশা ছিল, সেখানে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এমন শঙ্কা অত্যন্ত হতাশাজনক।
নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা টিকিয়ে রাখতে নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার কঠোরতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অভিযোগ এলেও কমিশন নীরব থেকেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে সত্যতা যাচাই করাই ছিল ইসির দায়িত্ব। প্রয়োজনে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি কিংবা বদলির মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারত কমিশন। সেটি না করায় মাঠ প্রশাসনের কাছে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের বক্তব্যও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারা বলছেন, আপিল নিষ্পত্তির ধাপটি হবে ইসির নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। এখানেই যদি অহেতুক প্রার্থিতা বাতিল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত আসে, তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতীতে দেখা গেছে, শুরুতে নমনীয়তা দেখালে পরবর্তী সময়ে আচরণবিধি প্রতিপালন করানো কঠিন হয়ে পড়ে। বড় দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ইসির অতিরিক্ত সহনশীলতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত থাকলেও তার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। নির্বাচনী মাঠে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভোটারদের ভয়মুক্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর শক্তি কোনো দলের সমর্থনে নয়, বরং আইনের শাসন ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে। কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন তারা দেখে- ক্ষমতাবান প্রার্থী হোক বা প্রভাবশালী দল, নিয়ম ভাঙলে সবাই সমানভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছে।
এখনও সময় আছে। মনোনয়ন ও আপিল নিষ্পত্তির পর্যায়েই যদি ইসি কঠোর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়, তবে অনেক অভিযোগের সুর থামানো সম্ভব। কিন্তু শুরুতেই যদি কমিশন নীরব থাকে, তাহলে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ভোটের দিন নয়- প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ন্যায় ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দাবি করে। নির্বাচন কমিশনের জন্য সেই পরীক্ষাই এখন চলছে।