বিদায়ের পথে থাকা ২০২৫ সালের আর মাত্র ৫ দিন বাকি। বছর শেষ হলেও দেশে এখন পর্যন্ত স্থবির ব্যবসা-বিনিয়োগ। ফুটপাত থেকে নামিদামি শপিংমল- কোথাও নেই জমজমাট বেচাকেনা। হোটেল, রেস্তোরাঁতেও নেই কাক্সিক্ষত ভিড়। শীত মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও পর্যটন এলাকাগুলোয় পর্যটকদের ভিড় কম। শিল্পোদ্যোক্তা, কলকারখানার মালিক ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই রয়েছেন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়। মৃতপ্রায় শেয়ারবাজার। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পথে ঘুরছেন। গত এক বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা যায়নি। রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের দাম কমেনি। মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও চড়া। নভেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও চাপের মুখে রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এ চাপ আরও বাড়তে পারে। অবশ্য এ চাপ সামাল দিতে কৃচ্ছ্রসাধনের পথেই হাঁটছে সরকার। জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণ ও গাড়ি কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে অর্থবছরের বাকি সময়েও। একই সঙ্গে ফেব্রুয়ারির আগেই বাজেট সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে কাজ শুরুও করেছে অর্থ বিভাগ।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে ভীষণ চাপ নিয়ে শুরু হয়। একদিকে নানা মহল থেকে দাবি, অন্যদিকে টালমাটাল দেশের অর্থনীতি সামলানোর মধ্য দিয়ে পার করেছে সরকার। ফলে বছর শেষেও গতি ফেরেনি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, প্রবৃদ্ধির গতি খুবই ধীর, প্রায় একই অবস্থায় আছে। নতুন বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। বিনিয়োগে খরা চলছে। বিনিয়োগ শুকিয়ে গেছে। অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষায় আছেন। কারণ তারা ভাবছেন নির্বাচনের পর নতুন সরকার এসে বর্তমান সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে, একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ অর্থনীতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।
জানা গেছে, বিদায়ী বছরে সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি ছিল সবচেয়ে কঠিন সমস্যা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা কাটার পর দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে জিনিসপত্রের দাম কমতে শুরু করলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি আলাদা ছিল। ২০২২ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি গড় হিসাবে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। টানা নয় মাস ধরে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দীর্ঘদিনের কড়াকড়ি আর্থিক ও মুদ্রানীতির কারণে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে। নভেম্বরে এসেও মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও বড় সমস্যা।
যদিও মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। ফলে ঋণের সুদহার এখনও বেশি। কঠোর মুদ্রানীতি ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রভাব এক সঙ্গে পড়ে বেসরকারি খাতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ২০২০ সালের করোনা মহামারী সংকটের পর এই প্রথম প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নিচে নামল। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এখন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকার কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর ভরসা রাখলেও বিশ্বব্যাংক ও এডিবি মনে করছে, প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে।
জানা গেছে, রপ্তানি খাতেও গতি কমেছে। বছরের শুরুতে রপ্তানি ভালো থাকলেও গত চার মাসে তা অনেকটাই কমে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমলের শুল্কনীতির কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রপ্তানি খঅতে। নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ২৪ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। প্রতিবছরের মতো শুল্ক-কর আদায়ে এবার পেছনে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর।
এনবিআরের হিসাব অনুসারে, গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি থাকায় রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে বছরের শেষদিকে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়বে বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁরা বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারের কাজ করছে এনবিআর।