চলে এলো বিজয়ের মাস। অগ্নিঝরা নয় মাসের সর্বস্ব পণ রাখা সংগ্রামের পর উনিশশ একাত্তরের ষোলো ডিসেম্বর স্বাধীন হয়েছিল আমাদের এই দেশ। শান্তিপ্রিয় বাঙালির এই বিজয় বা স্বাধীনতা শব্দটি শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ দিবস, সুদীর্ঘ রজনী। আমরা অর্জন করলাম ‘স্বাধীন’ শব্দটি উচ্চারণের অধিকার, হাঁটার অধিকার, সেই পথে যা আমার ভাইদের রক্ত দিয়ে রাঙানো, বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আর সন্তান হারানো মায়ের আজীবন অপেক্ষার মূল্য দিয়ে অর্জিত। বাঙালির এ আত্মত্যাগী অর্জন নিঃসন্দেহে অদ্বিতীয় আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। বর্তমান প্রজন্ম যারা মুক্তিযুদ্ধ চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেনি, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গভীর তাৎপর্য ও আবেদন বয়ে আনার স্পর্শাতুর ও দুরূহ কাজটি যারা করেছেন, তাদের এক বৃহৎ অংশ হচ্ছে লেখকগোষ্ঠী বা ভাষাযোদ্ধা।
মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য বা গল্পের পরিধি ব্যাপক বিস্তৃত। মোটাদাগে বলা যায়, ষাটের দশক থেকে শুরু করে নানা বৈচিত্র্য ও অনুষঙ্গে দিকপাল সাহিত্যিকরা তাদের ডানা ছড়িয়ে দিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের দিকে। শুধু ব্যক্তি অভিজ্ঞতার সুচারুবর্ণন নয় বরং একজন আধুনিক গল্পকার বা কথাসাহিত্যিকের মতো তারা ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্যের বাহ্যিক ঘটনার সঙ্গে কখনও ব্যক্তির মনোজগৎ, আবার কখনও যূথবদ্ধ গোষ্ঠীর অন্তর্জগৎ ব্যবচ্ছেদ করেছেন, আবার কখনও বা বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতাকে এক আঁচড়ে মিলিয়ে মিশিয়ে গল্পে এনেছেন আধুনিকতার স্পর্শ। তবে শুরুতে একটু জেনে নেওয়া যাক আধুনিকতা বলতে সাহিত্যে কী বোঝায়। সাহিত্যের আধুনিকতা বলতে বোঝায় ঊনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিমূর্ততা, ব্যক্তিনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা এবং নতুন অভিব্যক্তির ওপর জোর দেয়। নিয়ে আসে নতুন ভাষা ও ফর্ম। নতুন ধাঁচে, নতুন ছাঁচে তৈরি হয় শব্দবন্ধ। পুরনো রচনারীতির খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে আত্মসচেতনতা, নগরজীবনের জটিলতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং সমাজের বাস্তবতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া নতুন স্টাইল বা রীতি, যার মধ্যে ঢুকে যায় ঝঃৎবধস ড়ভ ঈড়হংপরড়ঁংহবংং কিংবা ঋৎধমসবহঃধঃরড়হ-ও। উপজীব্য হয় মানুষের মনস্তত্ত্ব, আধুনিক জীবনের সংকট এবং সম্পর্কের জটিলতা। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও মানসিক জটিলতার চিত্র অঙ্কন এবং অন্তর্লোকের ব্যবচ্ছেদ। অর্থাৎ পুরনো রীতিনীতির খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক সাহিত্য নিজেকে প্রকাশ করে নতুন রঙ আর নতুন ঢঙে। আর মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আধুনিকতাও এর বাইরে যেতে পারে না। তাই মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আধুনিকতা বলতে বোঝায় আধুনিকতার এসব বৈশিষ্ট্যকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন ধারার এক মুক্তিযুদ্ধের দলিলভিত্তিক সাহিত্য, যা নতুন বিষয়, আঙ্গিক ও শৈলী ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধকে পাঠকের সামনে তুলে এনেছে, যেখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্ব নয়, বরং যুদ্ধোত্তর সমাজের অবক্ষয়, হতাশা, মানবিক সম্পর্কের টানাপড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে নানা প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাবনা, চিন্তা, তাদের আশা ও আকাক্সক্ষার নান্দনিক শিল্পরূপ। মুক্তিযুদ্ধের আধুনিক গল্প ও উপন্যাসের মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প-উপন্যাসের নাম করা যেতে পারে। সেগুলো হলো- হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ’আগুনের পরশমণি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘নীলদংশন’, শওকত ওসমানের ‘দুই সৈনিক’, ‘নেকড়ে অরণ্য’, ‘জলাঙ্গী’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল, রোটি আওরাত’, শওকত আলীর ‘যাত্রা’, জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’, নাসরীন জাহানের ‘বিশ্বাস খুনি’ প্রভৃতি। এ প্রেক্ষাপটে হদয়ের তাজা শোণিত ঢেলে শহীদজননী জাহানারা ইমাম তার স্মৃতিচারণামূলক ডায়েরিতে লিখেছেন ‘একাত্তরেরর দিনগুলি’। রাবেয়া খাতুনের প্রচেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠি নিয়ে গ্রন্থিত হয়েছে মর্মভেদী সংকলন ‘একাত্তরের চিঠি’। যুদ্ধের পটভূমিতে গ্রামীণ জীবন ও নারীর আত্মত্যাগ নিয়ে সেলিনা হোসেন সৃষ্টি করেন ‘হাঙর, নদী, গ্রেনেড’। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক তরুণীর জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ের আখ্যান তুলে ধরেন মাহমুদুল হক ‘জীবন আমার বোন’ গল্পে। সংকলিত হয়েছে আবুল হাসনাতের সম্পাদনায় ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, হুমায়ূন আহমেদের সম্পাদনায় ‘মুক্তিযুদ্ধের বাছাই গল্প’। এ রকম আরও নানা বরেণ্য লেখকের গুরুত্বপূর্ণ লেখনীসম্ভার, যার পুরো তালিকা এই সামান্য পরিসরে তুলে ধরা মোটেই সম্ভব নয়। এ রচনাগুলো মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে, তুলে এনেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা, এঁকেছে মানুষের জীবনসংগ্রাম ও দেশপ্রেমের নানা দিগদিগন্ত। সৈয়দ শামসুল হক তার ‘নীলদংশন’ আখ্যানে যুদ্ধকালীন গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো উদ্ভাসিত করে তোলেন, যা আধুনিক কথাসাহিত্যের এক অনন্য স্তম্ভ। এসব নানা গল্পের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন উঠে এসেছে একাত্তরের নিদারুণ আঘাত, আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস, অন্যদিকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নানা বহির্দ্বন্দ্ব ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন, বাস্তবতা আর আকাক্সক্ষার এক জটিল ঘূর্ণি। তাই এই গল্পগুলো শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মানুষের মনস্তত্ত্ব, ত্যাগ এবং বিজয়ের চেতনা, যা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে যোগ করেছে এক অনুপম আধুনিক মাত্রা।
নাসরীন জাহানের ‘বিশ্বাস খুনি’ গল্পে আমরা দেখতে পাই তোফায়েল, ওসমান, আলতাফ ভাইয়ের মতো চরিত্রকে। তোফায়েলের আছে ‘অদ্ভুত গভীর চোখ, পাগলাটে চুল, শিশুর মতো হাসি, এমনই মুখ ওর, যেন মাথায় বোমা পড়লেও সেখানে বিষণ্নতা গ্রাস করবে না।’ তোফায়েল এমন এক চরিত্র, যে নাকি মিলিটারি গ্রামে আসায় সবাই যখন সিরিয়াস আলোচনায় ব্যস্ত, তখন অমল কমল সহজ জলের স্রোতে ভেসে প্রজাপতি এনে মিটিংয়ে সবার মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে। এর পরই গল্পে উঠে আসে একাত্তরের রক্ত হিম করা বর্ণনা- ‘এক ঝটকায় একজন পাকিস্তানি আর্মি ওসমানকে টেনে আনলো নিজের দিকে। ওসমান একটু বেশিই লম্বা, সারির মধ্যে একে বেখাপ্পা ঠেকছে। এই ছিল ওদের বক্তব্য। এইবার সারিটিকে উল্টোদিক থেকে দেখা। একদম ঢেউয়ের মতো, দূরবর্তী পাহাড়ের মতো, লম্বা হয়ে শিশুদের দিকে ঢালু হয়ে নেমে এসেছে। এদের হাসি দেখে শিশুরাও হাসছিল, কী রকম চাপা বিস্ময়ে, কিছু বুঝে উঠতে না পেরে। যেখানে হাসি, সেখানে শিশুরা বিপদের কি দেখবে? এর পরেই গর্জে উঠলো অস্ত্র।’
দেখতে পাই আলতাফ ভাইকে, যিনি ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার, যিনি প্রাণখোলা, নির্ভীক কিন্তু- ‘যখন কাজ, তখন এত সিরিয়াস, তার মুখের দিকে তাকানো যায় না।’ তালপাতার বাঁশি বাজানো তোফায়েলকে আলতাফ ভাই বিশ্বাস করতে পারে না, এতে বিচলিত হয় নরমহৃদয় ওসমান। আলতাফ ভাইয়ের নিষ্পাপ মুখের তোফায়েলকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টি ওসমানের হৃদয় করুণ বিষাদে ভরিয়ে তোলে। কিন্তু ঘটনাক্রম নাটকীয়ভাবে ক্রমশ মোড় নেয় এক ভিন্ন পরিসমাপ্তির দিকে। গল্পটিতে রয়েছে আধুনিকতার নানা ব্যঞ্জনা, কাহিনির বিন্যাস, অন্তর্জগতের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। চরিত্রচিত্রণে পারঙ্গমতা ও কাহিনির নাটকীয়তা গল্পটিতে দিয়েছে আধুনিক গল্পের বৈশিষ্ট্যযুক্ত এক অনন্য মাত্রা।
কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘পিতৃগণ’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস এবং ভূমিপুত্রদের আত্মত্যাগ ও ন্যায়যুদ্ধের এক গভীর চিত্র তুলে ধরেছে। এখানে তিনি প্রাচীন ইতিহাস ও আধুনিক মুক্তিযুদ্ধকে এক সুতোয় বেঁধেছেন, যেখানে ‘ভূমিপুত্র’ কৈবর্তদের সংগ্রামকে স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘পিতৃগণ’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং পোড়ামাটির নিচে চাপা পড়া ইতিহাসের শিল্পিত পুনর্গঠন, যেখানে প্রাচীন পাল আমলের কৈবর্ত বিদ্রোহকে (ভূমিপুত্রদের) মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসটি এক কবিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যেখানে ভূমিপুত্রদের বীরত্ব ও তাদের ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধকে মহাকাব্যিক রূপে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতার আদল, যা মূলত আজকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই প্রতিচ্ছবি। তাই মুক্তিযুদ্ধের গল্প কেবল নিছক গল্প নয় এর মধ্যে থরথর করছে বহু জীবন, এ দেশের মানুষ, মানুষের সংস্কৃতি তথা পুরো একটি দেশ। এ দেশের মানুষের হাসি, কান্না, আবেগ, সংস্কৃতি, চেতনা, আকাক্সক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ক্ষোভ, সন্তুষ্টি- সবকিছু একাকার হয়ে এক সুতোর মালায় গাঁথা পড়ে আর আধুনিকতায় ঋদ্ধ এক-একটা মুক্তিযুদ্ধের গল্পের মধ্য দিয়ে উঠে আসে জীবনের প্রত্যাশা, সংঘাত ও দোলাচল। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো হয়ে ওঠে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কালচারের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।