অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে দেশের শেয়ারবাজার। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি কোনোটির সঙ্গেই এই শেয়ারবাজারের কোনো সংযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা জানান, সারাবিশ্বে শিল্পায়নে মূলধনের জোগান আসে পুঁজিবাজার থেকে। যদিও বাংলাদেশে শিল্পায়নের মূলধন জোগানোর প্রধান উৎস ব্যাংক খাত। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের অবদান যৎসামান্য। বিদায়ের পথে থাকা ২০২৫ সালে দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। ফলে শিল্পখাতে দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন হচ্ছে না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পুঁজিবাজারে আইপিও আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতিতে যে অরাজকতা চলেছে, তার কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে আইপিওতে আসার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইপিও এলে শেয়ারবাজারে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় এবং বাজারে তারল্য বাড়ে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও বাজারে এলে নতুন বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং লেনদেনে গতি এসেছে। সে কারণে বাজারে প্রাণ ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত নতুন ও মানসম্মত কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। দীর্ঘ সময় আইপিও বন্ধ থাকলে বিনিয়োগের বিকল্প পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজারে এত দীর্ঘসময় ধরে আইপিও না আসার নজির আর কখনো দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ২০২২ সালের শুরুতেই দেশের পুঁজিবাজারে মন্দাভাব দেখা যায়, যা অব্যাহত রয়েছে। পুঁজিবাজারের এ নিম্নমুখিতার কারণে উদ্যোক্তারা কোম্পানির আইপিওতে আসতে আগ্রহ দেখান না। নিম্নমুখী বাজারে শেয়ারের প্রত্যাশিত দাম পাওয়া নিয়ে তাদের সংশয় থাকে। তা ছাড়া বিগত সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে যেভাবে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে, তাতে অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিলে সবার মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে দেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। যদিও সে প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অবস্থা পরিবর্তনে যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল, সেটিও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তার ওপর দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো বিনিয়োগে যাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য আইপিওতে আসছেন না কেউ। শেয়ারবাজারে সর্বশেষ আইপিও
এসেছে টেকনো ড্রাগসের। গত বছর জুনে এই কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে। এর পর আর কোনো কোম্পানির আইপিও আসেনি। অর্থাৎ দেড় বছর ধরে শেয়ারবাজারে আইপিও আসা বন্ধ রয়েছে। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় আইপিও না আসার ঘটনা আর ঘটেনি। এমনকি একটি পুরো বছরে আইপিও না আসার ঘটনাও এটিই প্রথম।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে কার্যকর আইপিও বিধিমালায় একাধিক ধারা ও শর্ত রয়েছে, যা উদ্যোক্তাদের কাছে জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ন্যূনতম মুনাফা, অডিট-সংক্রান্ত শর্ত, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রয়োগ এবং মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে আইপিওতে যেতে একটি কোম্পানিকে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় যেমন বাড়ে, তেমনি ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। এক সময় এই পদ্ধতির মাধ্যমে অতিমূল্যায়িত শেয়ারের আইপিও আসায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা শর্ত কঠোর করলেও উদ্যোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমানে এই পদ্ধতির কাঠামো খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে অনেক ভালো কোম্পানি সরাসরি ব্যাংক ঋণ বা প্রাইভেট ইকুইটির দিকে ঝুঁকছে এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, শেয়ারবাজারের প্রধান সমস্যা হলো এখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য ইক্যুইটি নেই। তার মতে, শুধু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলেই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে মৌলভিত্তিসম্পন্ন নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। চলতি বছরের মে মাসে প্রধান উপদেষ্টা এক বৈঠকে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দেন। তবে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।