নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যয়ে বাড়তি গতি অর্থনীতিতে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। একদিকে সরকারি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রার্থী ও তাদের সমর্থক, আত্মীয়স্বজনের খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ব্যয় করতে প্রবাসীরাও বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ফলে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে এবং ভোগ ব্যয়ের চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত খরচ আরও বাড়বে। এ ছাড়া নানা পেশার মানুষ ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন শহর থেকে বাড়ি ফিরছেন। তারা বাড়ি গেলে সেখানেও বিভিন্ন কারণে অর্থ খরচ করে থাকেন।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে অর্থনীতিতে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা বাড়ে। মানুষ খরচ করে, অর্থ ঘুরেÑ এতে সাময়িকভাবে হলেও অর্থনীতি গতি পায়। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক ব্যয় এক ধরনের স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনার মতো কাজ করে। এই অর্থ খুব দ্রুত গ্রাম ও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে কিছুটা আর্থিক সুবিধা পান, যার সামাজিক প্রভাবও তুলনামূলক ইতিবাচক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যয়ের কারণে ভোগ বেড়েছে; বিশেষ করে বেভারেজ, চা, বিস্কুট, কেক, মুদ্রণ ও পরিবহন খাতে। নির্বাচনের সময় এসব খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, যা সাময়িকভাবে অর্থনীতিতে গতি তৈরি করে।

রাত পোহালেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলÑ সবখানেই এখন নির্বাচনী আলোচনা। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবার কথাবার্তায় ভোটের প্রসঙ্গ। প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা দিন-রাত ভোটারের কাছে ছুটছেন। ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণে নেওয়া হচ্ছে নানা কর্মসূচি, আয়োজন করা হচ্ছে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে অর্থনীতি। ফলে টং দোকানের চা বিক্রেতা থেকে শুরু করে গণপরিবহন ও ছোট ব্যবসাÑ সবখানেই নির্বাচনী তৎপরতার ছাপ পড়েছে।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের দুই হাজার প্রার্থী ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ২৪৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এসব আসনে ১২ কোটি ৭৩ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৬ লাখ, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৬ লাখ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ১১৩ জন। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের আকস্মিক মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে পরে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে।

ভোটারের কাছে পৌঁছাতে প্রচার, যাতায়াত, সভা-সমাবেশ, আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পেছনে প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। অর্থনীতিবিদরা একে ‘নির্বাচনী অর্থনীতি’ হিসেবে দেখছেন। এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছে মুদ্রণ, প্রচার ও পরিবহন খাত। হ্যান্ডবিল, লিফলেট, ব্যানার ও ফেস্টুন ছাপিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে ছোট ও মাঝারি প্রিন্টিং প্রেসগুলো। মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেওয়া ব্যবসায়ীরাও কাজের চাপে। সভা-সমাবেশ ও ভোটার যোগাযোগে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়ায় পরিবহন খাতেও বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বিক্রিতেও।

নির্বাচন কমিশনের নির্ধারণ অনুযায়ী, একজন প্রার্থী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা বা ভোটারপ্রতি ১০ টাকাÑ যেটি বেশি, সেটি পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। ২৯৯টি আসনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থী যদি প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা করে ব্যয় করেন, তাহলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাস্তব ব্যয়ের অঙ্ক আরও বড়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিÑ এই দুই মাসে ব্যাংকিংব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ এখন বাজারে হাতে হাতে ঘুরছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনী প্রচারণা ও মাঠপর্যায়ের খরচ মেটাতে প্রার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করছে।

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে রেমিট্যান্সেও ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রবাসীরা ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেশে পাঠিয়েছেন। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা একক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম আট দিনে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। এ সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৯০ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত রমজান বা ঈদকেন্দ্রিক সময়ে রেমিট্যান্স বাড়ে। কিন্তু এবার মৌসুমি কারণের বাইরে গিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে প্রবাসীদের একটি অংশ অতিরিক্ত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেনÑ এমন ইঙ্গিত মিলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *