মিয়ানমারে স্ক্যাম সেন্টার বা প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত আরও চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে চীন। মাফিয়া গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ‘বাই’ পরিবারের সদস্য ছিলেন সাজাপ্রাপ্তরা। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের গুয়াংডং প্রদেশের একটি আদালতে প্রতারণা, হত্যা ও গুরুতর আঘাতসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বাই পরিবারের সদস্য ও সহযোগী মিলিয়ে মোট ২১ জনের মধ্যে তারা ছিলেন। গত নভেম্বরে আদালত এই চক্রের প্রধান বাই সুওচেং-সহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে সাজা ঘোষণার পর অসুস্থতায় বাই সুওচেং-এর মৃত্যু হয়।
এতে আরও বলা হয়, গত সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিচালিত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রতারণা ও অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়ে কুখ্যাত মিং পরিবারের ১১ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে চীন। এসব প্রতারণা চক্রের ফাঁদে পড়ে হাজার হাজার চীনা নাগরিক সর্বস্বান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বছরের পর বছর ধরে বাই, মিংসহ আরও কয়েকটি পরিবার মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী শহর লাউক্কাইংয়ে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। সেখানে তারা ক্যাসিনো, রেড-লাইট এলাকা এবং সাইবার স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করত। আটক হওয়ার পর বাই সুওচেং-এর ছেলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বাই পরিবার ছিল ‘এক নম্বর’।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাই পরিবার তাদের নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত এবং সাইবার অপরাধ ও ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য ৪১টি কম্পাউন্ড বা আস্তানা তৈরি করেছিল। সেসব কম্পাউন্ডের ভেতরে মারধর ও নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।
আদালত জানায়, বাই পরিবারের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে ছয়জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, একজন আত্মহত্যা করেছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
২০০০ সালের শুরুর দিকে লাউক্কাইং শহরের তৎকালীন এক যুদ্ধবাজ নেতাকে উৎখাতের পর বাই পরিবার ক্ষমতায় আসে। ওই সামরিক অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মিন অং হ্লাইং, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান। তৎকালীন ওই নেতা একজন নিরাপদ সহযোগী খুঁজছিলেন এবং বাই সুওচেং (যিনি তখন ওই যুদ্ধবাজ নেতার ডেপুটি ছিলেন) সেই চাহিদা পূরণ করেছিলেন।
তবে ২০২৩ সালে এই মাফিয়া সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এসব স্ক্যাম সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বেইজিং ক্ষুব্ধ হয় এবং পরোক্ষভাবে ওই অঞ্চলে জাতিগত বিদ্রোহীদের অভিযানে সমর্থন দেয়। এটি মায়ানমারের গৃহযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় স্ক্যাম মাফিয়ারা ধরা পড়ে এবং তাদের সদস্যদের বেইজিংয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। চীনে তাদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়, যেখানে অনলাইনে প্রতারণা চক্রের নির্মূলে নির্মূলে চীনা কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়। সাম্প্রতিক এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে বেইজিং মূলত সম্ভাব্য প্রতারকদের একটি সতর্কবার্তা বা প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মিয়ানমারসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা চালাতে শত শত হাজার মানুষকে পাচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে হাজার হাজার চীনা নাগরিকও রয়েছেন, আর যাদের কাছ থেকে তারা প্রতারণার মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে, সেই ভুক্তভোগীদের বড় অংশও চীনা নাগরিক বলে জাতিসংঘের হিসাবে জানা যায়।