কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। ব্যাংকিং থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে গণমাধ্যম- প্রায় সব খাতেই AI দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাসের নামে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা যতটা সম্ভাবনার কথা বলছে, ততটাই গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। রিপোর্ট লেখা, ডেটা বিশ্লেষণ, ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা, অনুবাদ, তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা ও শিক্ষার কিছু জায়গা দখল করছে অ্যালগরিদম। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি অশনিসংকেত।
আমাদের দেশের তরুণরা মধ্যম দক্ষতার চাকরির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে গণবেকারত্ব ডেকে আনতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো দক্ষতার বৈষম্য। AI যুগে টিকে থাকতে প্রয়োজন ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীলতা। কিন্তু বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পরীক্ষাভিত্তিক ও মুখস্থনির্ভর। এর ফলে তরুণরা শিক্ষিত হয়েও কর্মহীন থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যকে আরও গভীর করছে। বড় কাপোরেশন ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী লাভবান হলেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ আয় ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া AI ব্যবহারে নৈতিকতা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে নেই নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা। নিয়োগ প্রক্রিয়া ও কর্মক্ষমতা মূল্যায়নে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত পক্ষপাত, ভুল সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহির অভাব বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
মানুষকে প্রভাবিত করার সিদ্ধান্ত যদি যন্ত্র নেয়, তবে সেই যন্ত্রের দায় কার? আইন, শ্রমনীতি, সামাজিক সুরক্ষা ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি- কোনোটাই AI যুগের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও নীতি ও প্রশাসন পিছিয়ে রয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রাকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে নতুন শিল্প, পেশা ও উন্নত জীবনমানের পথ খুলে যাবে। আমাদের প্রয়োজন একটি মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তি নীতি। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, আজীবন দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ- এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই AI-কে সহায়ক শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। নচেৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠবে আমাদের জীবন-জীবিকার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।