দেশের অর্থনীতিতে গরিব-দুঃখী সবাই অবদান রেখে যাচ্ছে। আমাদের যে উন্নয়ন, তা বড় দুটো বড় খাত থেকে আসে। একটি বিভিন্ন পর্যায়ের কর, আরেকটা প্রবাসী আয়। ভিক্ষুক, শিল্পপতি এমনকি নবজাতক শিশুকেও কর দিতে হয়। অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে যাচ্ছে। যতদিন অর্থনীতি শুধুমাত্র একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন দেশের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করা ছাড়া দেশের আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল হাতিয়ার।
গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এ বক্তাদের আলোচনায় এসব বিষয় ওঠে আসে। ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শিরোনামে এ সম্মেলনের আয়োজন করে দৈনিক বণিক বার্তা। পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সম্মেলনে দেশের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এ অধিবেশনে আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. একে এনামুল হক, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ, বিএসএমএ’র সভাপতি ও
জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন। সম্মেলনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও সমাপনী অধিবেশনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ অধিবেশনে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন সাবেক সিনিয়র সচিব মো. শফিউল্লাহ। সমাপনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এ অধিবেশনে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।
খেলাপি ঋণের সংকট কাটাতে ৫-১০ বছর সময় লাগবে : উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ ছোটখাটো কোনো সমস্যা নয়। দেশে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। বাকি দুই-তৃতীয়াংশের ওপর নির্ভর করে ব্যাংক চালাতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি পুরো আর্থিক খাতকে চাপের মুখে ফেলেছে। প্রতি প্রান্তিকেই দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। দুই বছর আগে আমার ধারণা ছিল, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশের মতো হবে। তখন সরকার বলেছিল তা ৮ শতাংশ। এখন দেখছি এটি এরই মধ্যে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে। পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন ও শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘চোর ধরা’ মনোভাবভিত্তিক : উদ্বোধনী অধিবেশনে বিআইডিএস মহাপরিচালক একে এনামুল হক বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘চোর ধরা’ মনোভাবভিত্তিক। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। একটি অর্থনীতি যদি আস্থানির্ভর না হয়, তাহলে ব্যবসা বা বিনিয়োগ কিছুই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম করার মতো দায়বদ্ধতার কাঠামো নেই। দেশের করব্যবস্থা আজও ‘জমিদারি ব্যবস্থার’ মতো আচরণ করে। ব্রিটিশ শাসনে জমিদারের কাজ ছিল কর আদায়। দেশের উন্নতির দায়িত্ব তাদের ছিল না। আজকের কর সংগ্রহেও একই মানসিকতা দেখা যায়।
উন্নয়নের সুফল একটি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে : দ্বিতীয় অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে গেছে। যতদিন অর্থনীতি শুধুমাত্র একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন দেশের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করা ছাড়া দেশের আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অর্থনীতি গণতন্ত্রের অংশ হতে হবে এবং এটি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হতে হবে। এ জন্য আমাদের নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন গ্রামীণ জনগণও উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে দেশে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বিএনপির রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারখানা বন্ধ নয়, লুটেরাদের শাস্তি দিন : দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত ১৫ বছর যারা ব্যাংক লুট করেছে, দেশে লুটপাট করেছে, চুরি করেছে- তাদের ধরুন, শাস্তি দিন। কিন্তু তাদের শিল্প কারখানায় হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। আলোচনায় এসেছে, ১৪ লাখ মানুষ কর্ম হারিয়েছে। তাঁরা যাবে কোথায়? আমরা কেন এই বেকারত্ব সৃষ্টি করছি? বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। বিএনপির কাছে সর্বদা অর্থনীতি গুরুত্ব পেয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপি যতবার সরকারে ছিল কেউ বলতে পারেনি আমরা অর্থনীতি ধ্বংস করেছি। বরং বলা হয়েছে রাইজিং স্টার।
অর্থনৈতিক বিষয়টি ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে : তৃতীয় অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গরিব-দুঃখী সবাই অবদান রেখে যাচ্ছে। যেহেতু সমাজের দায়িত্ব সবাই সমানভাবে নিচ্ছে, সেহেতু অর্থনৈতিক বিষয়টিও ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অর্থনীতিতে যেমন বিভিন্ন সরকারি মারপ্যাঁচ, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে, তেমনি সেখানে অনেক দুর্বৃত্তপনাও আছে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা দাঁড় করাতে অনেক জটিলতা পার করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এ দুর্বৃত্তপনাকে রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। রাজনীতির বাইরে কোনো অর্থনীতি নেই। সব নীতি সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ ও বিকশিত করবে রাজনীতি। ব্যবসায়ীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল হাতিয়ার।
নির্বাচন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে : সমাপনী অধিবেশনে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এটি গণতন্ত্রের একটি পথ। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধান বাধা হচ্ছে অস্বচ্ছ নির্বাচন অঙ্গন। এটি স্বচ্ছ করতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গন অস্বচ্ছ ও এখানে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন রয়েছে। এটিকেও স্বচ্ছ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে নির্বাচন একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে আর ব্যবসাকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, টাকার খেলা ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। তবেই স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব।
জন-আকাক্সক্ষা উপেক্ষিত হলে ফের অভ্যুত্থান-পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে : সমাপনী অধিবেশনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা উপেক্ষিত হলে নতুন করে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অংশ হলেও এর মূলে ছিল জনগণের সার্বিক উন্নতির আকাক্সক্ষা। বর্তমানে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মহানগরগুলোর উঠতি মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার সুরাহা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।