যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব ও ইরাকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে এ অঞ্চলের সব ফ্লাইট। সব ধরনের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। চলমান এ যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি করা পেট্রোলিয়াম পণ্য ও এলএনজির দাম বাড়তে পারে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। হামলা দীর্ঘমেয়াদি হলে সংকটে পড়বে বিশ্ববাণিজ্য।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারে কয়েক দিন ধরে চরম অস্থিরতা চলছে। এসব শেয়ারবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার গতকাল ছিল পতনের ধারায়। যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজারে যে পতন ঘটেছে, সেটা এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের অবস্থাও একই রকম। জাপানের শেয়ারবাজারে ৭ শতাংশের বেশি পতন ঘটেছে গত কয়েক দিনে। এ ছাড়া এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে গম, ভুট্টা ও সয়াবিন তেলের বাজারও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী দেখা গেছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যের সরবরাহ চেইন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। যার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং কোথাও কোথাও খাদ্যের মজুদে সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ইরান যদি আর এক সপ্তাহ টিকে যায়, তা হলে আমেরিকা বিপদে পড়তে পারে। তখন মধ্যপ্রাচ্যকে
নতুনভাবে ভাবতে হবে ইরানকে নিয়ে। এই যুদ্ধে ইকোনমি এতই নাজুক হতে পারে যে সামনে আমাদের মতো গরিব দেশের ভার বইতে পারবে না। এতে করে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে। তেলের দামসহ সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়বে। কোভিডের চেয়ে কম হবে না এর ইম্প্যাক্ট। যা স্থায়ী হবে হয়তো আগামী কয়েক বছর। টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে দেশ চালানোর ব্যয় অনেক অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর এর আঘাত আসবে বলে মনে করেন এ খাতসংশ্লিষ্টরা। এর ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্ববাণিজ্য। দেশের ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোভিড-১৯-এর সময় বিশ্ব অর্থনীতি যে ধাক্কা খেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ৭ মাস ধরে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। আসছে জুনের পর আমরা এই নেতিবাচক ধারা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা করেছিলাম, কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেটা নাও হতে পারে। এ ছাড়া সামনের এই পতনের ধারাকে আরও ত্বরান্বিত করবে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশিদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কর্মসংস্থান। পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে। সেখান থেকে আসে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৪৯ শতাংশ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইরান। দেশগুলোয় প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।