সহিংসতামুক্ত নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র পথ: জেসমিন টুলী

জেসমিন টুলী নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব; নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনব্যবস্থা, ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র বিশেষজ্ঞ। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ, নির্বাচনকালীন সহিংসতা, মব কালচার, অপতথ্য ও রাজনৈতিক আস্থা, নারী প্রার্থী, গণভোটসহ নানা বিষয় নিয়ে দৈনিক আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রণজিৎ সরকার

আমাদের সময় : আপনি বলেছেন, ভালো নির্বাচন আয়োজনের কোনো বিকল্প বাংলাদেশের সামনে নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনকালীন সহিংসতার ঝুঁকি আপনি কতটা দেখছেন?

জেসমিন টুলী : একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করতে হলে কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন শুধু মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা নয়- এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার। গুজব, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টেকনিক্যাল সক্ষমতা, বিশেষ করে ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি, যেখানে দ্রুত এসব মোকাবিলা করা যায়। পুলিশিং যদি আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান না হয়, বিশেষ করে ভোটের দিন, তাহলে সহিংসতার ঝুঁকি থেকেই যাবে। নির্বাচন সামনে রেখে কোথায় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে- সে অনুযায়ী বাহিনী মোতায়েন, ভোটারদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন কল্পনা করা যায় না।

আমাদের সময় : নির্বাচনের সময় দলবদ্ধ সহিংসতা বা ‘মব কালচার’ একটি বড় উদ্বেগ। এতে ভোটারদের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

জেসমিন টুলী : ভোটার যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে প্রথম যে প্রভাবটি পড়ে, তা হলো ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কমে যাওয়া। মানুষ শুধু ভোট দিতে যাওয়ার ভয়েই নয়, ভোট দিয়ে ফেরার পর কী হবে- এই শঙ্কায়ও ভোগে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা মূলত ভোটার অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে। ভোটার যদি মনে করেন, ভোট দেওয়ার পরও তিনি বা তার পরিবার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তাহলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক অর্থেই ব্যর্থ হয়। এ কারণে নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে না আনে, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা রোধ করা শুধু পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের সময় : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে। তার পরও যদি কোনো কারণে কোনো জটিলতা তৈরি হয়, কোনো পক্ষ যদি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে এই নির্বাচন এবং গণভোটের ফলাফল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে কি গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে করেন?

জেসমিন টুলী : নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে নতুন নয়। অতীতেও দেখা গেছে- পরাজয়ের শঙ্কা তৈরি হলে দলগুলো শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ছোট বা মাঝারি কোনো দল নির্বাচন বর্জন করলে সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর বড় প্রভাব পড়ে না। কিন্তু বড় কোনো রাজনৈতিক জোট বা শক্তি যদি নির্বাচন থেকে সরে যায়, তাহলে সেই নির্বাচন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক- দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গণতন্ত্রের মূল শর্তই হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

আমাদের সময় : গণভোটের ফলাফল নিয়ে আপনার ধারণা কী?

জেসমিন টুলী : গণভোট সাধারণত সহজ কোনো বিষয়ে হয় না। সংবিধান সংশোধন বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মতো জটিল বিষয়ই গণভোটে আসে। বাস্তবতা হলো- প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এসব জটিলতা পুরোপুরি বোঝে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সঠিকভাবে প্রচারণা চালায় এবং সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে সচেতনতা তৈরি করতে পারে, তাহলে মানুষ গণভোটে অংশ নেবে। বাস্তবে ভোটাররা অনেক সময় নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেন।

আমাদের সময় : অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বললে, বাংলাদেশের নির্বাচনে সহিংসতার প্রধান উৎসগুলো কী- রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, নাকি প্রশাসনিক দুর্বলতা?

জেসমিন টুলী : মূল সমস্যা আইন না মানার প্রবণতা। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যখন মুখোমুখি অবস্থানে যান, তখন কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। উসকানিমূলক বক্তব্য, দোষারোপের রাজনীতি এবং ‘যেকোনো মূল্যে জেতার’ মানসিকতাই সহিংসতার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি আগাম তথ্যের ভিত্তিতে সক্রিয় থাকে, তাহলে অনেক সহিংসতাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আমাদের সময় : আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রায় সব দল ও প্রার্থীর বিরুদ্ধেই উঠছে। এ ধরনের অনিয়ম কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতার পথ তৈরি করে?

জেসমিন টুলী : অবশ্যই। আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কঠোরতা এখনও দৃশ্যমান নয়। মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং অফিসারদের শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আইন ভাঙলে প্রার্থী বড় না ছোট- তা বিবেচ্য নয়। শাস্তি কার্যকর করে তা প্রকাশ্যে জানালে অনিয়মের প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, প্রশ্নবিদ্ধও করতে পারে।

আমাদের সময় : সহিংসতা রোধে সরকারের সদিচ্ছা কীভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত?

জেসমিন টুলী : এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন কমিশন একা এটি মোকাবিলা করতে পারবে না। টেকনিক্যাল সংস্থা, সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দল- সবাইকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব নয়, কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগে অপপ্রচার অনেকটাই কমানো যায়।

আমাদের সময় : আপনি নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের একজন সদস্য ছিলেন। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং আপনার মতে সেই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে এবং কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলোর মধ্যে কোনগুলোকে আপনি সবচেয়ে মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখেন?

জেসমিন টুলী : রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে বড় সংস্কার। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন, নিয়মিত কমিটি নির্বাচন এবং মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ না হলে নির্বাচনব্যবস্থার কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরে সেই অর্থ তুলতে গিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকা উচিত- ব্যবসায়ী বা আমলানির্ভরতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

আমাদের সময় : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩১টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। ২০টি দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র মিলে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৬ জন। দেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মর্যাদা, ক্ষমতায়ন, সমতা ও মুক্তির বাস্তবতা কতটুকু, তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এ বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, নারীবাদী ও সচেতন রাজনৈতিক মহল শঙ্কিত এবং কিছুটা আতঙ্কিত। নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ কী?

জেসমিন টুলী : আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা এখনও নারীবান্ধব নয়। অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতিতে নারীরা কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে। দলগুলো অনেক সময় নারীদের এমন আসনে মনোনয়ন দেয়, যেখানে জয়ের সম্ভাবনা কম। তৃণমূল থেকে উঠে আসা নারীদের নেতৃত্বে আনতে হলে দলীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের সময় : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত করতে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও নাগরিক সমাজ- সবার জন্য আপনার প্রধান বার্তা কী?

জেসমিন টুলী : রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে- ভোটারদের রায় মেনে নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনকে কোনো ছাড় না দিয়ে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ভোটার ও প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। সহিংসতামুক্ত নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র পথ।

আমাদের সময় : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

জেসমিন টুলি : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *