তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যতের রাষ্ট্র

এ কথা এখন প্রায় সবাই বিশ্বাস করে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে যে নেতৃত্বের সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেন একমাত্র তারেক রহমান। পরিবর্তিত বাংলাদেশে আগামী দিনে আমরা কেমন রাষ্ট্র দেখতে চাই, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমরা কেমন রাষ্ট্রপরিচালক দেখতে চাই? বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে আমরা যদি ধরে নিই জননেতা তারেক রহমান হবেন সেই রাষ্ট্রপরিচালক, তাহলে শুরুতে আমাদের ভাবতে হবে কেমন দেখতে চাই আমাদের সেই নেতাকে? ফ্যাসিস্টবিরোধী ২৪-এর অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান আমাদের মানসপটের অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। জনগণের অভিপ্রায়ও এখন এক নতুন বাংলাদেশের। এই বাংলাদেশে আমাদের মানসপটে কাক্সিক্ষত রাষ্ট্রনায়কের যে ভাবমূর্তি হাজির হয়, তিনি হবেন উদার, মানবিক, গণতান্ত্রিক এবং একই সঙ্গে কঠোর হবে তার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।

আপাতদৃষ্টিতে আমরা দেখতে পাই এক উদার ও পরিণত চিন্তার তারেক রহমানকে, যিনি নিজে গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রকাশিত আঁকা ব্যঙ্গচিত্রকে অ্যাপ্রিশিয়েট করেন সানন্দে। ভয়ের সংস্কৃতির বিপরীতে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সামনে আনেন, যেমনÑ বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে আমরা দেখেছি গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা, যেখানে ইচ্ছা করলেই শাসককে তুলাধোনো করা যেত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত কোনো এক বিশেষ উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারÑ এমনকি ব্যক্তি তারেক রহমানকে নিয়ে অনেক অপপ্রচার ছিল, যার বিশেষ কোনো সত্যতা ছিল না। কিন্তু অপপ্রচারগুলোকে সংবাদ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হলেও ওই সব গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে দল হিসেবে বিএনপি বা সরকার কখনও কোনো বিষোদগার করেনি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন, তেমনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করেননি, এরই ধারাবাহিকতা তারেক রহমানের বেলায়ও অব্যাহত থাকবে, এমন একটা আশা সবাই পোষণ করছে।

তারেক রহমান তার ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে সাবেক সেনা আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে জেনারেল রুমির কাছে মার্জনা চেয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। দলের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নেতার আচরণগত সৌন্দর্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যে তার নানা মানবিক গুণের ছাপ তিনি রেখেছেন। আবার একই সঙ্গে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী নেতাকর্মীদের দমন করেছেন শক্ত হাতে। দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপি বেশ কঠোর এটা আমরা দেখেছি ২০০১-০৬ সালের শাসনামলে। যখন সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের দমনে অপারেশন ক্লিনহার্ট গঠন করা হয়, তখন বিএনপির অনেক শৃঙ্খলাচ্যুত কর্মী দমনের শিকার হন। দল করেন বলে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। যদিও পেশিশক্তি ও বলপ্রয়োগের রাজনীতির ক্ষেত্রে এ কারণে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী রাজনীতি মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়তে হয়েছে, তবু বিএনপি তার ইমেজ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপরাধে বহু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা একজন কঠোর নেতার দেখা পেয়েছি। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের দায় ও দরদের জায়গা থেকে এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও আমরা দেখতে পাই। আগুনে পুড়ে যেমন সোনা খাঁটি হয়, তেমনি কালস্রোত ও ঘাত-প্রতিঘাতে পরিপক্ব হয় মানুষ।

বিএনপির ৩১ দফা ছাড়াও আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তারেক রহমান অনলাইনে বিভিন্ন মতবিনিময় সভায় যে বক্তব্য দেন, সেখানে দেখা যায় তিনি নতুন পরিবর্তনের পক্ষে। আমরা যে ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা কল্পনা করি, বিএনপি যেন ঠিক সেই ধরনের রূপকল্প প্রস্তাব করে আসছে। আশা করা যায়, একজন আদর্শ নেতা হিসেবে তারেক রহমান সেই সব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবেন। কারণ চিকিৎসা, শিক্ষা ও ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে সারফেসের পানি নিয়ে সম্প্রতি তার দুটি ভিডিও ক্লিপে আমরা যে একজন ভিশনারি নেতাকে দেখতে পাই, এ রকম একজন রাষ্ট্রপরিচালকই এখন বাংলাদেশের দরকার। এ ছাড়া নারীর কর্মক্ষেত্রকে নারীবান্ধব করার জন্য তিনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটাও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর কাজের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। বেগম খালেদা জিয়ার ভিশনারি পদক্ষেপের কারণে এ দেশের নারীশিক্ষায় যেমন ব্যপক অগ্রগতি ঘটেছে, তেমনি এ দেশের কর্মক্ষেত্রেও নারীরা বিপ্লব সাধন করে দেশের সার্বিক উন্নতিতে সহায়ক হবে, এমনটা আশা করা যায়।

গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে লন্ডনে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন ৪ কোটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে। এ রকম একজন ভিশনারি নেতা আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। আমরা দেশ নিয়ে, দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি সর্বোপরি দেশ বাঁচানোর জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করি, তারেক রহমান যেন সেই সব আশার কথাই আমাদের শোনান। এ দেশের কোনো নেতা এভাবে ভাবতে পারেন এটা সত্যিই বিস্ময়কর! বিগত সরকারের সময়ে আমরা যেমন বহুবার আমাদের লেখার মাধ্যমে বলতে চেয়েছি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটা দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নয়, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে হয় এর মৌলিক উন্নয়নের মাধ্যমে। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, প্রকৃতিÑ এসব ধ্বংস করে দেশের উন্নয়ন হয় না। যে কোনো দেশের পরিবর্তনের দুটি রূপ থাকেÑ একটি পরিমাণগত পরিবর্তন, আরেকটি গুণগত পরিবর্তন। এই দুটি পরিবর্তনের সমন্বয় সাধিত হলে দেশটি গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষার যাত্রা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছায়। আগামীর বাংলাদেশে তারেক রহমান হবেন সেই ভিশনারি নেতা, যিনি এসব পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

গাজী তানজিয়া : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *