প্রাচীনকাল থেকেই নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। নারীর শ্রম-মেধা চিরকালই অর্থমূল্যহীন পারিবারিক সেবামাত্র। বিনিময়ে বাসস্থান-আহার-বস্ত্র ছাড়া তার যেন আর অন্য কোনো দাবি থাকতেই পারে না। সমাজে পিতৃতন্ত্র যত গেড়ে বসেছে, ততই যেন নারীদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। নারী বৈষম্যের শিকার হয় তার নিজ পরিবারেই। পুত্রসন্তানটি সব অধিকার ভোগ করলেও কন্যাটির অধিকার থাকে সংরক্ষিত; সেটিই হলো নারীর প্রতি বৈষম্যের প্রথম পাঠ। তারপর কালক্রমে সে বুঝতে পারে যে, আর্থিক অধিকার চাইলে বিপদসংকুল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, সেই বিপদ মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি বা জোর অনেকেরই থাকে না।
নারীর আর্থিক স্বাধীনতা মানে হলো তার আয়, সম্পদ ও নিজের সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে, যা স্বাস্থ্যবান ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে, বৈষম্য কমাতে এবং লিঙ্গীয় পক্ষপাত দূর করতে অপরিহার্য। এটি ব্যাংকিং সুবিধা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব, যা এখনও অর্জিত হয়নি। আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীকে তাদের বাবা এবং স্বামীর সম্পত্তি থেকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করা হয়। এর ওপর রয়েছে শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকের নিত্যনতুন চাহিদার ফর্দ। এ ক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মাঝে তফাৎ সামান্যই। ফলে নারীরা চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এ কারণে নারীদের অধিক হারে কর্মসংস্থান অপরিহার্য। আজ নারীরা বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করছেন, তা সত্ত্বেও সব কর্মরত মহিলা আর্থিকভাবে স্বাধীন নন। নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পরিবারে-সমাজে সে নিজেকে অনেকটাই নিরাপদ রাখতে পারে, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন থেকে বাঁচাতে পারে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাদের প্রতি সহিংসতা-নির্যাতন মেনে নেয় তাদের আর্থসামাজিক, মূলত আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে।
নারীর প্রতি নির্যাতনের বিষয়ে আমাদের সমাজ অত্যন্ত সহিষ্ণু, নমনীয়। খুব বড় ধরনের সহিংসতা যেমন- তীব্র শারীরিক আক্রমণ, হত্যা, খুন বা ধর্ষণ, এমন ঘটনাগুলো না ঘটা পর্যন্ত আমাদের সমাজ নারীর প্রতি সহিংসতা হয়েছে বলে বিবেচনায় নেয় না। নারীরা নানা সহিংসতার মুখোমুখি হয় নিত্যদিন। স্বামীর অনুমতি না নিয়ে বাইরে যাওয়া, সন্তানদের প্রতি যত্নশীল না হওয়া, স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা, যৌন সম্পর্কে অস্বীকৃতি জানানো, খাবার পুড়িয়ে ফেলার মতো অতি তুচ্ছ যেকোনো অন্তত একটি কারণে নারীর মার খাওয়াকে যৌক্তিক মনে করে এ দেশের ২৫.৪ শতাংশ নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) রিপোর্টে পনেরো থেকে ঊনচল্লিশ বছর বয়সের বিবাহিত নারীদের মানসিকতার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে ধারণা করা যায়, নারীরা নিজেরাই তাদের অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়ে সচেতন নয়।
সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৭ শতাংশ নারী শ্রমশক্তির অংশ, যেখানে পুরুষদের মধ্যে তা প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০২২ সালের বিবিএস জরিপে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামে ৫০ দশমিক ৮৯ ও শহরে ২২ দশমিক ৫৯ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ নারী ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে, যার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে উল্লেখযোগ্য লিঙ্গবৈষম্য ফুটে উঠেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের যে ৩ কোটি মানুষ ব?্যাংকিং সুবিধার বাইরে তাদের বেশির ভাগই গ্রামে বাস করে। এই গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ শতাংশই নারী, যারা এখনও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাকের মতো বিষয়গুলোতে নারীর ন্যূনতম অধিকার ও মর্যাদা রক্ষিত হচ্ছে না। এসব কারণে সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতিবছর অসংখ্য নারী মৃত্যুবরণ করে। নারী নীরবেই সহ্য করে যায় সব অত্যাচার-নির্যাতন। এ ছাড়া মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে কত নারী যে ধুঁকে ধুঁকে মরছে তার পরিসংখ্যানগত হিসাব হয়তো নেই। কিন্তু নারীমাত্রই জানে প্রতিনিয়ত কতটা অবহেলা, অসম্মান আর আত্মসম্মানহীনতার ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয়। নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটাও চরম অবহেলিত, উপেক্ষিত। উপযুক্ত শিক্ষার দ্বারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে মানবজীবনে মর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে নারীর মুক্তি আসবে।